হোস্টিং কি? সব ধরনের ওয়েব হোস্টিং নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।

  • আপডেট সময় : সোমবার, ৯ জুলাই, ২০১৮
  • ৬২১ বার পঠিত
হোস্টিং ডেটা সেন্টার
হোস্টিং ডেটা সেন্টার

একটি ওয়েবসাইট করতে গেলে ডোমেইন কিনার পরেই আমাদেরকে যে বিষয়টিকে কিনতে হয় সেটি হচ্ছে একটি ওয়েবসাইটের হোস্টিং।
শুরুতেই আমরা জানব হোস্টিং কি জিনিস?
আমরা অনেকেই জানি যে ডোমেইন হচ্ছে একটি ওয়েবসাইটের নাম। তো একটা ওয়েবসাইটে সাধারণত কি কি থাকে? যেমন ধরুন আপনার একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং সেই প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ওয়েবসাইট তৈরি করবেন। তো সেই ওয়েবসাইটে কি কি তথ্য থাকবে? সে ওয়েবসাইটে আপনার যে প্রতিষ্ঠান আছে ও প্রতিষ্ঠানের যারা বিভিন্ন কর্মী আছে, তাদের ছবি থাকবে, তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য থাকবে। আপনার প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? তারপর অফিসের ছবি থাকবে, বিভিন্ন ক্লাইন্টদের তথ্য থাকবে এবং আপনার প্রতিষ্ঠান কি কি সেবা প্রদান করে সেগুলোর বিভিন্ন তথ্য/ছবি ইত্যাদি থাকবে।

তো এইযে আপনার প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটটিতে আপনার প্রতিষ্ঠানের যে কন্টেন্ট ( কোন লিখা, তথ্য, ছবি, গান, ভিডিও যে কোন কিছু ) থাকবে। এগুলো সব তো একধরনের ফাইল তাইনা? এ ফাইলগুলো আপনি কোথায় রাখবেন? এটাই হচ্ছে একটি মূল প্রশ্ন!

কারন এই ফাইলগুলো কিন্তু এমন না যে আপনি আপনার কম্পিউটারে রেখে দিবেন এবং সে ফাইলগুলো যে কেউ দেখতে পারবে। করন একটা ওয়েবসাইট সম্পর্কে আমরা কি জানি? আমরা জানি একটা ওয়েবসাইট হচ্ছে বিশ্বব্যাপী এবং এটা অনলাইনে থাকে সবসময়।
ধরলাম আপনার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তথ্য আপনার কম্পিউটারে আছে, তো আপনি রাতের বেলা কম্পিউটার বন্ধ করে ঘুমিয়ে গেলেন। কেই একজন চাচ্ছে আপনার প্রতিষ্ঠানের ইনফরমেশন আপনার ওয়েবসাইট থেকে দেখতে! তো আপনি তো আপনার কম্পিউটার বন্ধ করে দিয়েছেন, তো কিভাবে দেখবে আপনার প্রতিষ্ঠানের সেই তথ্যগুলো? কারন আপনার কম্পিউটার তো বন্ধ।

তো এই ক্ষেত্রে আমরা যেই কাজটি করি আসলে আমাদের প্রতিষ্ঠানের যে তথ্যগুলো রয়েছে, যেগুলা আমরা চাই সেগুলো যেন আমাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সবাই দেখতে পাক। তো এই তথ্যগুলোকে ইন্টারনেট সংযোগ আছে এমন একটি কম্পিউটারে পাঠিয়ে দেওয়া হয় যে কম্পিউটার ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে অর্থাৎ বছরে ৩৬৫ দিন সবসময় চালু থাকবে। যাতে করে আপনার ওয়েবসাইট যে কেউ দিনে কিংবা রাতে যেকোন সনব আপনার প্রতিষ্ঠানের  তথ্যগুলো দেখতে পায়।

তো এইযে আমরা যে কম্পিউটারের কথা বললাম সেই  কম্পিউটারে অনেক স্টোরেজে রয়েছে। তো আপনার কম্পিউটারের ফাইলগুলো কোথায় থাকে? আপনার কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে অবশ্যই? ঠিক একইভাবেই আমাদের এটা এমন একটি কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে রাখতে হবে যেটা সবসময় ওপেন থাকে এবং আপনার এই  তথ্যগুলো যখনই কোন ইউজার আপনার ওয়েবসাইটে ঢুকবে তখন তাকে এই তথ্যগুলো একটি ওয়েব পেজ এর মাধ্যমে প্রদর্শন করাবে। তো এইযে যেই জায়গাটায় বা হার্ডডিস্কটায় ফাইলগুলো রাখা হয়েছে এটাকেই সহজ ভাষায় বলা হয় হোস্টিং অথবা এটিকে সার্ভারও বলা হয়ে থাকে।

ইন্টারনেট রেখাচিত্র
ইন্টারনেট রেখাচিত্র

এই সার্ভারে আপনি আপনার যাবতীয় কন্টেন্টগুলো স্টোর করে রাখবেন। যেহেতু আপনার মূল্যবান তথ্যগুলো এখানে স্টোর করা থাকবে তাই সেখানে সিকিউরিটি অ্যাক্সেস থাকে। আবার স্পীড এর একটা ব্যাপার আছে, যেটাকে ব্যান্ডউইথ বলা হয়। এই সকল বিষয়গুলো আপনার হোস্টিং প্যাকেজ এর উপর নির্ভর করে থাকে। আপনার ওয়েবসাইট সবসময় চালু থাকবে কিনা বা যথাযথ সেবা পাচ্ছেন কিনা তা আপনার হোস্টিং প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করে।

হোস্টিং বিভিন্ন প্রকারের আছে।যেমন: শেয়ার হোস্টিং, ভিপিএস, ডেডিকেটেড সার্ভার ইত্যাদি। আপনার ওয়েবসাইটের প্রয়োজন অনুযায়ী আপনি হোস্টিং স্পেস ক্রয় করবেন।

বিভিন্ন প্রকার ওয়েব হোস্টের ব্যাখ্যা

শেয়ারড হোস্টিং

শেয়ারড হোস্টিং

পেশাদারী বা বড় কোন ওয়েবসাইটের জন্য একটি স্বয়ংসম্পূর্ন সার্ভারের নির্দিষ্ট পরিমান সার্ভিস দরকার পড়ে।এই সকল সুবিধা নিজস্ব সার্ভারে নিয়ে আসতে হলে বেশ ব্যয়বহুল হয়ে যায়। এই ব্যয় সামাল দেওয়ার জন্য অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে শেয়ারড হোস্টিং উপযুক্ত।

শেয়ারড হোস্টিং হচ্ছে সবচেয়ে সাধারন হোস্টিং সমাধান যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বল্প খরচ। কিন্তু আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি এর ব্যয় কেন এত কম? কারন এই হোস্টিং এর সকল রিসোর্স (যেমন: অপারেটিং সিস্টেম, ডিস্ক স্পেস, ব্যান্ডউইথ ইত্যাদি) অন্যান্য অনেক ব্যবহারকারীদের সাথে ভাগাভাগি করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ শেয়ারড হোস্টিং একাধিক ব্যবহারকারীদেরকে তাদের তথ্যগুলি হোস্ট বা সংরক্ষণ করার অনুমতি দেয়। একাধিক ব্যবহারকারীদের সংখ্যা কয়েক শত থেকে হাজার হাজার পর্যন্ত হয়।

ধরুন আপনি যেই হোস্টিং প্রতিষ্ঠান থেকে হোস্টিং প্যাকেজ কিনেছেন সেইখানে আরো ১০০০ জন ব্যক্তি সেই একই ধরনের প্যাকেজটি ক্রয় করেছে, তাহলে আপনি সেই হোস্টিং সার্ভার এর ১/১০০০ ভাগ আপনি ব্যবহার করতে পারবেন। অর্থাৎ পুরো খরচের ১০০০ ভাগের ১ ভাগ আপনার কাছ থেকে হোস্টিং প্রতিষ্ঠানটি নিচ্ছে। এ কারনেই শেয়ারড হোস্টিং এর দাম এত কম হয়ে থাকে।

শেয়ারড হোস্টিং ছোট যে কোন ওয়েবসাইটের জন্য যথেষ্ট। তবে এটি  ব্যবহার ক্ষেত্রে অনেক ধরনের সু্যোগ – সুবিধার সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়। যখন আপনার ওয়েবসাইট এবং গ্রাহকের পরিধি ও প্রসার বাড়তে থাকে, আপনি দেখবেন আপনার ওয়েবসাইট ঠিক আগের মত আর  ইউজার ফ্রেন্ডলি পাবেন না। আপনার ওয়েবসাইট হোস্টিং এর গোপনীয়তা না থাকার কারনে আপনি চাইলেও সর্বাধিক নিরাপত্তা দিতে পারছেন না যেহেতু সার্ভার প্রবেশ আপনার উপর নির্ভর নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শেয়ারড হোস্টিং বাদ দিয়ে আপনাকে ভিপিএস বা ডেডিকেটেড হোস্টিং এ যেতে হবে।

বর্তমানে বিভিন্ন হোস্টিং প্রতিষ্ঠান তথ্য স্টোর করে রাখার জন্য হার্ডডিস্কের বদলে এসএসডি স্টোরেজ সেবা প্রদান করে থাকে। এর ফলে ওয়েবসাইটের পেইজ খুব দ্রুত লোড হয়। অবশ্য ভাল হোস্টিং প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে হোস্টিং করালে শেয়ারড হোস্টিং প্যাকেজে সর্বোচ্চ ৯৯.৯৯% আপটাইম, আনলিমিটেড ডিস্ক স্পেস (আসলে এক লক্ষ ফাইল পার হলে আর আপলোড করতে দেয়না), আনলিমিটেড ব্যান্ডওয়াইডথ, আনলিমিটেড ডেটাবেস এবং ফ্রি সিপ্যানেল (cPanel) সুবিধা গুলি পেতে পারেন।

অসুবিধার দিকগুলো হলো নিজের ডোমেইন নেমের ক্ষেত্রে কোন ডেডিকেটেড আইপি পাবেন না, কোন সফটওয়্যার ইনস্টল দিতে পারবেন না (সার্ভারে) এছাড়া আরো সীমাবদ্ধতা আছে। আসলে তাদের প্রধান সার্ভারটির সিপিইউ এর ২৫ থেকে ৩০ ভাগ এর বেশি ব্যবহার করে ফেললে তাহলে নানান ধরেন সমস্যা শুরু হতে দেখবেন। যেহেতু সব আনলিমিটেড লেখা থাকে তাই সিধাপথে বলবেনা যে আপনোকে ডেডিকেটেড সার্ভার নিতে হবে। যখনি আপনার ওয়েবসাইটে প্রচুর গ্রাহক সময়াহার দেখা দিবে তখনি আপনার হোস্টিং প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানটি নানান কথা এবং কাজের মাধ্যমে বুঝাতে চাইবে তাড়াতাড়ি ডেডিকেটেড সার্ভার নিন। যদি না বোঝেন তাহলে ধীরে ধীরে আপনার ওয়েবসাইট অচল বা বন্ধ করে রাখবে। ঠিক তখন আপনি আপনার প্রিয় ওয়েবসাইটটিকে বাঁচাতে হোস্টিং প্যাকেজটি আপগ্রেড করতে লেগে যাবেন।

ভিপিএস হোস্টিং

ভিপিএস হোস্টিং

শেয়ারড এবং ডেডিকেটেড হোস্টিং এর মধ্যপর্যায় হল ভিপিএস হোস্টিং। সহজ ভাষায় ভিপিএস হল একটা ভার্চুয়াল কম্পিউটার, ঠিক আপনার ব্যক্তিগত কম্পিউটারের মত। ভিপিএস হোস্টিং কিনলে ঐ ভার্চুয়াল কম্পিউটার আপনি ব্যবহার করতে পারবেন যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে। যেমন করে আপনার ব্যক্তিগত কম্পিউটার আপনি যেভাবে ব্যবহার করেন।

এই হোস্টিং ঠিক শেয়ারড হোস্টিং এর মতো করে একটি সার্ভারে একাধিক ওয়েবসাইট সংরক্ষন করে রাখবে। অর্থাৎ আপনার ওয়েবসাইটের জন্য সাধারনত একটা ডেডিকেটেড সার্ভারের সিপিইউ, মেমরী ও সমস্ত রিসোর্স ইত্যাদি কয়েকজনকে আলাদা করে ভাগ করে দেয়া হবে। যেমনঃ ১৬ জিবি র‍্যামের একটি সার্ভারের থেকে আপনাকে দিল শুধু ৪ জিবি এবং অন্য ৩ জন ব্যবহারকারীকে দিল বাকিগুলি। একই সার্ভারে থাকা অন্য ওয়েবসাইটগুলো আপনার জন্য সংরক্ষিত রিসোর্সগুলো কোনমতেই ব্যবহার করতে পারবে না। আপনি আপনার ইচ্ছামত ওয়েবসাইটের বিভিন্ন অংশ একাধিক সার্ভারে ভাগ ভাগ করে রাখতে পারবেন। তবে ডেডিকেটেড সার্ভারের মত কোনরকম নিজের ইচ্ছে অনযায়ী যেকোন সফটওয়্যার ইনস্টল দিতে পারবেন। যতখুশি আপনার ওয়েবসাইট সংরক্ষণ বা হোস্ট করতে পারবেন এই সার্ভারে। আপনার ওয়েবসাইট লোড হবে চোখের পলোকে।

আপনার ভিপিএস সার্ভিস হোস্টিং প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করে। সিপিইউ, র‍্যাম কিন্তু সমানভাবে ভাগ নাও হতে পারে। তিন ধরেনের অধিকার পেতে পারেন ভিপিএসএ-
অধীনে-পরিচালিত : আপনাকে দেওয়া সফ্টওয়্যার ব্যবহার করা ও সেই মতো পরিচালনা করা।
অর্ধ-পরিচালিত: স্ট্যান্ডার্ড সফটওয়্যার হোস্টিং প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রন করবে এবং কাস্টম কিছু সফট হোস্টিং ক্রেতা পরিচালনা করতে পারবে।
সম্পূর্ণ-পরিচালিত: সফটওয়্যার নিজেরাই সেটআপ করা যাবে।

শেয়ারড হোস্টিং এ আপনার ওয়েবসাইটসহ আরও বহু ব্যবহারকারীর ওয়েবসাইট হোস্ট করা হয়।যার ফলে ওয়েবসাইটের লোড স্পিড কমে যায়, একটু গ্রাহকের পরিমাণ বাড়লেই সাইট অফলাইন হওয়াসহ নানা জটিলতায় পরতে হয়। কিন্তু ভিপিএস হোস্টিং এ সেসব হয় না। এক মাসে যদি লক্ষ লক্ষ গ্রাহকও আপনার ওয়েবসাইটে আসে তাহলে বন্ধ কিংবা ধীর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সাধারনত তখন এরুপ হোস্টিং প্যাকেজ কিনবেন যখন একটা ডেডিকেটেড সার্ভারের সকল রিসোর্স আপনার লাগবেনা, তাহলে কাজও হল কিছু অর্থ সেভ হল।এই ভিপিএস হোস্টিং আপনাকে বাড়তি ব্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে।

ডেডিকেটেড হোস্টিং

ডেডিকেটেড হোস্টিং

আপটাইম কি?
যে হোস্টিং প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে আপনার ওয়েবসাইটটি হোস্ট করাবেন তাদের সেই সার্ভার যতক্ষন পর্যন্ত চালু থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত আপনার ওয়েবসাইটও চালু থাকবে। প্রায় সমস্ত হোস্টিং প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতি দেয় ৯৯.৯৯% আপটাইম দেবে। শুধুমাত্র খুব ভালো হোস্টিং প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সার্ভার সারা বছরে কেবল মাত্র ৪-৫ মিনিট বন্ধ থাকে। কিন্তু কাজের বেলায় এসব প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা যায়না (বিশেষ করে বাংলাদেশী হোস্টিং প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে)।যদি সার্ভার বন্ধ বা অচল থাকা অবস্থায় কেউ আপনার ওয়েবসাইটে ঢুকতে চায় তাহলে ঢুকতে পারবেনা, এমনকি সার্চ ইন্জিনগুলোর সার্চ রেজাল্টেও দেখাবেনা। এরফলে আপনার সার্চ ইন্জিন অপটিমাইজেশন ব্যার্থতায় পর্যবশিত হবে।গুগল আপনার সাইটের স্থান (Ranking) অনেকখানি নিচে নামিয়ে দেবে।

ফেসবুক মন্তব্যসমূহ

প্রকাশনাটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো পোস্ট